এগারো শিব মন্দির যশোর।

বাংলাদেশের যশোর জেলার প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার একটি এগারো শিব মন্দির। একটি কিংবা দুটি নয়, একসাথে এগারো টি শিব মন্দিরের অবস্থান রয়েছে এই জায়গাটিতে। প্রায় ৩০০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই শিব মন্দির গুলোর সাথে জড়িত আছে নানা ইতিহাস। এগারো শিব মন্দির যশোর জেলার অভয়নগর উপজেলার বাঘুটিয়া ইউনিয়নে এই স্থানটি অবস্থিত।

ভৈরবের পাড়ে গড়ে ওঠা এই শিব মন্দিরের সাথে জড়িত আছে এক দুঃখী রাজ কন্যার ইতিহাস। ইতিহাসের শুরু জানতে হলে ফিরে যেতে হবে বারো ভূঁইয়াদের আমলে। বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম যশোরের রাজা প্রতিপাদিত্য। মুঘলদের সাথে যুদ্ধে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্য পরাজিত ও বন্দী হলে তখনকার রাজ পরিবারের সদস্যরা নানা দিকে ছিটকে পড়ে। যুদ্ধ পরাজিত এই রাজপরিবারের এক সদস্য ভাগ্য অন্বেষণে এসে পড়েন যশোরের চাচড়া অঞ্চলে। এদেরই উত্তরপুরুষদের একজন রাজা নীলকণ্ঠ রায় পরিশ্রম আর সৌভাগ্যে ধন দৌলত আর শক্তি সামর্থ্য গড়ে তুলেছিলেন।

নীলকণ্ঠের আমলে এই যশোর অঞ্চলে বন দস্যুদের প্রকোপ ছিলো বেশি। সুন্দরবন পার হয়ে নদী দিয়ে এসে গ্রামের পর গ্রাম লুঠ করে নিয়ে যেতো দুর্বৃত্তরা। এমনকি শিশু ও নারীদের ধরে নিয়ে গিয়ে প্রাচার করে দিতো। এই সমস্যার সমাধানে নীলকণ্ঠ রায় ভৈরবের পাড়ে এসে দুর্গ নির্মাণ করেন ও বসবাস করতে থাকেন।

তৎকালে ভৈরব নদের পড়ে হিন্দুদের তীর্থস্থান ছিলো ভাটপাড়া। ভাটপাড়ার পাশেই রাজা দুর্গ ও রাজ প্রাসাদ নির্মাণ করেন।

এগারো শিব মন্দির

এখানে রাজা নীলকণ্ঠের একমাত্র কন্যা অভয়া বেড়ে উঠে এবং প্রাপ্ত বয়স্ক হলে তার বিয়ে ঠিক করা হয় নড়াইল জমিদার বংশের পুরুষ নীলাম্বর রায়ের সাথে। দুর্ভাগ্যের এসে হানা দেয় অভয়ার সংসারে। বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে অভয়ার স্বামী নীলাম্বর মৃত্যুবরণ করে। এবং অভয়ার বিধবা জীবন শুরুর সাথেই জড়িত এই এগারো শিব মন্দিরের উত্থান। উনি ছিলেন মহাদেব শিবের উপাসক। অকাল বৈধব্যের আঘাতে বাকি জীবন অভয়া শিবের আরাধনা করে কাটাতে পিতার নিকট অনুরোধ করে একটি শিব মন্দির গড়ে দেয়ার।

নীলকণ্ঠ মেয়ের ইচ্ছে পূরণে প্রায় ৬০ একর জায়গা জুড়ে ১১ টি শিব মন্দির নির্মাণ করে দেন। মন্দিরের নির্মাণকাল ১৭৪৫ থেকে ৬৮ সাল। পরবর্তীতে এই অভয়ার নামেই নগরের নাম রাখা হয় অভয়নগর।

এগারো শিব মন্দির

চমৎকার কারুকার্য খচিত এই মন্দির গুলো পরস্পর পরস্পরের দিকে মুখ করে নির্মিত। প্রতিটি মন্দিরে প্রবেশের জন্য রয়েছে খিলান আকৃতি ও উপ-প্রবেশ পথ, বাঁকানো ও কোণা আকৃতির কার্নিশ। ছাদ গুলো দুই স্তরে তৈরি। ভেতরের ছাদ গোলাকার। বাহির থেকে যা চালার মতো দেখতে। এখানে মন্দিরের উত্তর পশ্চিম কোনে একটা পুকুর ও রয়েছে। যদিও তা দখলদারদের অধীনে। এছাড়া পুরো জমিটার অনেক টাই দখলে রয়েছে। আর রাজবাড়িটিও নেই। বেশি। ১৯৭১ সালে স্থানীয় দুর্বৃত্তদের দ্বারা মন্দিরের মূল্যবান কষ্টিপাথরের মূর্তি,লোহার কড়ে,বর্গা,ইট,কাঠ লুণ্ঠিত হয়। প্রত্যেকটি মন্দিরের একটি করে শিব লিঙ্গ ছিলো। তাও চুরি হয়ে যায়। এখন মাত্র একটি শিব লিঙ্গ অবশিষ্ট রয়েছে।

দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত আর সংস্কারের অভাবে মন্দির গুলোর বেহাল দশা হয়ে ছিলো। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে এর সংস্কারের কাজ শুরু হয়। যা শেষ হয় ২০১৭ সালে। যা মন্দির গুলোকে নতুন রূপ দেয়।

প্রতি বছর চৈত্র সংক্রান্তিতে এখানে পূজা পার্বণ হয় ও মেলা বসে। অনেক দূর থেকে মানুষ এসে এখানে মেলায় সামিল হয়।

আসা যাওয়া:

যশোর সদর উপজেলা হতে এগারো শিব মন্দিরের দূরত্ব ৪৫ কিলোমিটার। এখানে আসতে হলে যশোরের অভয়নগর থেকে অটো বা মোটর সাইকেলে করে ভৈরব নদীর পাড়ে ভাটপাড়া বাজার আসতে হবে। ঘাট থেকে নৌকায় নদী পার হয়ে বামে আধা কিলোমিটার গেলেই মন্দিরটি চোখে পড়ে। এছাড়া খুলনার ফুলতলা থেকেও মোটরসাইকেল নিয়ে আসা যায়।

Leave a comment

Design a site like this with WordPress.com
Get started